গাজীপুরে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মহোৎসব সংকটে শিল্পাঞ্চল, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর:
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী গাজীপুরে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের মধ্যেই অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। শিল্পকারখানা, আবাসিক ভবন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ডাইং, ওয়াশিং ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অবাধে চলছে অবৈধ গ্যাস ব্যবহার। এতে একদিকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।
তিতাস গ্যাস সূত্র জানায়, গাজীপুরে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই চলছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পাঞ্চল। অথচ এই সংকটের মধ্যেও থেমে নেই অবৈধ সংযোগের বাণিজ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনই নতুন নতুন অবৈধ সংযোগ যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী, আরিচপুর, বৌ বাজার, পাগার, স্টেশন রোড, কলেজ গেইট, মিলগেইট, এরশাদ নগর, বোর্ডবাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, শিববাড়ী, ভোগড়া, জয়দেবপুর, রাজেন্দ্রপুর, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বাইমাইল, সফিপুর, মাওনা, পূবাইল, গাছা, দক্ষিণ সালনা, হোতাপাড়া ও কালিয়াকৈর সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক বাসায় বৈধভাবে ১ বা ২টি চুলার অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে ৮ থেকে ১২টি পর্যন্ত চুলা। অনেক ভবনে বৈধ সংযোগের আড়ালে গোপনে পাইপলাইন টেনে একাধিক ফ্ল্যাট, ভাড়া ইউনিট ও ছোট কারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে গ্যাস। এসব অতিরিক্ত সংযোগ ও চুলার বিপরীতে স্থানীয় দালালদের নিয়মিত মাসোহারা দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাসোহারা দিলেই মিলছে সংযোগ
এলাকাভিত্তিক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু দালাল ও পাইপলাইন মিস্ত্রির মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ নেওয়া হয়। সংযোগপ্রতি কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। পরে মাসিক ভিত্তিতে আদায় করা হয় চাঁদা। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।
বিশেষ করে টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও বোর্ডবাজার এলাকার বহুতল ভবনগুলোতে বৈধ সংযোগের আড়ালে অবৈধভাবে অতিরিক্ত চুলা ব্যবহার এখন অনেকটাই প্রকাশ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “মাসোহারা ঠিকমতো পৌঁছালে কোনো সমস্যা হয় না।”
শিল্পাঞ্চলেও অবৈধ লাইনের ছড়াছড়ি
শুধু আবাসিক খাতেই নয়, শিল্পাঞ্চলেও অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের বিভিন্ন ডাইং, ওয়াশিং, গার্মেন্টস, ফুড প্রসেসিং ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানায় অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত বার্নার ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে গোপনে নতুন লাইন স্থাপন করা হয়।
বিশেষ করে টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার মোল্লা বাড়ি সংলগ্ন তারা টেক্স গার্মেন্টসের পাশের একটি ওয়াশিং ফ্যাক্টরিতে অবৈধ গ্যাস লাইন স্থাপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া আউচপাড়া খাঁপাড়া রোড, খৈরতুল মদিনা পাড়া ও আশপাশের এলাকাজুড়ে অবৈধ সংযোগের বিস্তার ঘটেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, গাজীপুরে ২ হাজারের বেশি বড় শিল্পকারখানা রয়েছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ছোট ও অনিবন্ধিত কারখানাসহ প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েক হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর হওয়ায় সংকটের সুযোগে অবৈধ বাণিজ্য আরও বিস্তার লাভ করেছে।
জাতীয় গ্রিডে বাড়ছে চাপ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ সংযোগের কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বৈধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ পাচ্ছেন না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় এবং কমছে রপ্তানি সক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যখন গ্যাস সংকট তীব্র, তখন অবৈধ ব্যবহার বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। কারণ অবৈধভাবে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ গ্যাসের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব সরকারের কাছে নেই।
তিতাস কর্মকর্তার বক্তব্য
তিতাস গ্যাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“গাজীপুরে গ্যাসের চাহিদা অনেক বেশি, কিন্তু সরবরাহ সীমিত। অবৈধ সংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও প্রভাবশালী মহলের চাপ ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে স্থায়ী সমাধান অনেক সময় সম্ভব হয় না।”
তিনি আরও বলেন,
“অনেকেই বৈধ সংযোগ নেওয়ার পর গোপনে অতিরিক্ত লাইন সংযুক্ত করেন। এতে যেমন সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি পুরো সিস্টেমের ওপর চাপ বাড়ছে।”
হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে সরকার বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অথচ বিশেষ জরিপ, স্মার্ট মিটার ও ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এসব সংযোগ বৈধতার আওতায় এনে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ দেশের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অবৈধ সংযোগের এই বাণিজ্য টিকে থাকায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জনমনে প্রশ্ন
সরকার যখন গ্যাস সংকটের কথা বলছে, তখন বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ কীভাবে টিকে থাকে—এ প্রশ্ন এখন গাজীপুরবাসীর মুখে মুখে। কারা এই অবৈধ বাণিজ্যের নেপথ্যে, কেন অভিযানের ঘোষণা এলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে না—তা নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সাধারণ মানুষের দাবি
গাজীপুরবাসীর দাবি, অবিলম্বে অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বৈধ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এবং জাতীয় সম্পদের অপচয় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
রিপোর্টার: Admin মাহবুব আলম জুয়েল
ক্যাটাগরি: দেশের খবর
